কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করছে কৃষকরা
কৃষিতে ব্যবসায়িদের থাবা: বাড়ছে উৎপাদন খরচ, কমছে ফলন
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
৩০-০৯-২০২৬ ০৩:০৪:০৯ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
৩০-০৯-২০২৬ ০৩:০৪:০৯ অপরাহ্ন
ফাইল ছবি
নিজের দুই বিঘা জমিতে এবছর শসার চাষ করেছেন জিয়াউর রহমান। নড়াইল সদর উপজেলার বিছালাী ইউনিয়নের বিছালী গ্রামের এই কৃষক স্থানীয় দোকান থেকে কীটনাশক কিনে তা শশা ক্ষেতে প্রয়োগ করেন।
তবে কোনো ফল মেলেনি তাতে। একদিকে উৎপাদন খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে কমেছে ফলন।
জিয়াউরের ভাষ্য, `আগে যেসব ওষুধ ছিল, তা জমিতে দিলে কাজ হতো। কিন্তু এখন যেসব ওষুধ বাইর হইছে, তাতে কাজ হচ্ছে না।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘ধরেন শসায় এখন যে ওষুধ দিচ্ছি, তা আগে দিলে পোকামাকড় আসতো না, কিন্তু এখন সেই একই ওষুধে কোনো কাজ হচ্ছে না। তিন দিন পরই পোকামাকড় ফিরে আসতেছে।’
জিয়াউর আরো বলেন, ‘আগে যে ফলন ছিল এহন সে ফলন নেই। আগে দুই বিঘা জমিতে থেকে ১৫ থেকে ১৬ মণ শসা ছিড়িছি।
এহন দুই মণই ছিড়তি পারিনে। এই ফলন কমে যাওয়ার মূল কারণ ওষুধ।
সদর উপজেলার কলোড়া ইউনিয়নের আগদিয়া গ্রামের আরেক কৃষক ইমন খন্দকার। ক্ষেতের চারায় কীট-পতঙ্গের আক্রমণ দেখলেই ছুটে যান স্থানীয় আগদিয়া বাজারে কীটনাশকের দোকানে। সবজির সমস্যা, পোকা-মাকড়ের আক্রমণ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেন দোকানদারকে।
তার কথা অনুযায়ী কী কীটনাশক ব্যবহার করবেন, কতটুকু দেবেন, কতবার দেবেন সব পরামর্শ দেন ওই কীটনাশক ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীর নির্দেশনা অনুযায়ী কীটনাশক ব্যবহার করেন তিনি।
ইমন খন্দকারের ভাষ্য, ‘এসব বিষয়ে কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ওষুধ প্রয়োগ সম্পর্কে তেমন কোনো পরামর্শ পান না তিনি। এ কারণে সমস্যা সমাধানে স্থানীয় দোকানিদের পরামর্শ কীটনাশক প্রয়োগ করি।’
জিয়াউর রহমান ও ইমন খন্দকারের মতো নড়াইলের অনেক কৃষকই ফসলে রোগ বা পোকার ধরন না জেনেই কীটনাশক ব্যবহার করছেন। জমিতে পোকা দেখা দিলেই ছুটছেন স্থানীয় কীটনাশকের দোকানে। দোকানিকে সমস্যার কথা বলে তার পরামর্শ অনুযায়ী কিনছেন ওষুধ। কোন কীটনাশক কতটুকু দিতে হবে, কতবার প্রয়োগ করতে হবে কিংবা ওই ওষুধ আদৌ ওই পোকার জন্য কার্যকর কিনা— এসব না জেনেই তা ব্যবহার করছেন অনেকে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকালে নড়াইল জেলা শহরের রূপগঞ্জ এলাকার নড়াইল বীজ ভাণ্ডার নামের কীটনাশকের দোকানে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায় সেখানে ক্রেতাদের ভিড়। কেউ কিনছেন বীজ, কেউ কীটনাশক। কৃষকরা তাদের ক্ষেতে রোগবালাই ও কীট-পতঙ্গের আক্রমণ সম্পর্কে দোকানদারকে জানাচ্ছেন। দোকানদার সে অনুযায়ী কীটনাশক দিচ্ছেন। তবে দোকানটিতে চেয়ার পেতে বসে থাকতে দেখা যায় কীটনাশক কম্পানির দুই প্রতিনিধিকে।
কীটনাশক বিক্রি ও এর ব্যবহার বিধি সম্পর্কে কৃষি অফিস তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন দাবি করে নড়াইল বীজ ভাণ্ডারের মালিক ছোটন মোল্যা বলেন, ‘কীটনাশক বিক্রি সম্পর্কে আমাদের ধারণা রয়েছে। কৃষি অফিস থেকে বছরে দুই-তিনটা প্রশিক্ষণ দেন আমাদের। দোকানে এসেও আমাদের ধারণা দেন তারা। কীটনাশক বিক্রির সঙ্গে আমরা অনেক বছর ধরে জড়িত। কীটনাশক কম্পানির প্রতিনিধিরা থাকেন, তাদের পরামর্শ মত দিয়ে থাকি। অনেক ক্ষেত্রে চাষিরা আমাদের কাছ থেকে চেয়ে নেন।’
বিছালী ইউনিয়নের আরেক কীটনাশক ব্যবসায়ী বলেন, ‘কীটনাশক কম্পানির লোকজন আমাদের কাছে ওষুধ দিয়ে যান। চাষিরা চাইলে আমরা তাদের কাছে বিক্রি করি। কম্পানির লোকজন আমাদের কাছে যেভাবে বিক্রি করতে বলেন, সেভাবে বিক্রি করি।’
তবে কৃষকদের কাছে কীটনাশক পৌঁছানো ও ব্যবহারের বিষয়ে কম্পানির নিজস্ব ব্যবস্থাপনার কথা জানিয়ে লারসেল কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাইভেট লিমিটেডের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মো. মিশন হোসেন বলেন, ‘আমাদের কীটনাশক কৃষকের হাতে পৌঁছায় পাইকারি সরবরাহকারীর মাধ্যমে। এ ছাড়া আমাদের প্রতিনিধি রয়েছে, তারা কৃষকদের ব্যবস্থাপত্র দেন। আমরা কৃষকদের নিয়ে সভা-সমাবেশ করে কীটনাশক সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।
নিজেদের কীটনাশক শতভাগ ভালোমানের দাবি করে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা আমাদের কীটনাশকের তালিকা কৃষি অফিসে দিয়ে থাকি। তারা যাচাই-বাছাই করে মানসম্মত হলেই আমাদের ওষুধগুলো কৃষকদের ব্যবহারেরে জন্য বলে থাকেন। কৃষক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি আমরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মোট কীটনাশক পাইকারি ব্যবসায়ী রয়েছে ৩৯ জন, খুচরা ডিলার ডিলার রয়েছে ৪৩২ জন। এর মধ্যে নড়াইল সদর উপজেলায় পাইকারি ব্যবসায়ী রয়েছেন ২৭ জন, খুচরা ১৯৫ জন; লোহাগড়ায় পাইকারি তিনজন, খুচরা ডিলার ১০০ জন এবং কালিয়া উপজেলায় পাইকারি ৯ জন এবং খুচরা ডিলার রয়েছেন ১৩৭ জন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক ( উদ্ভিদ সংরক্ষণ) সৌতম কুমার শীল বলেন, ফসল উৎপাদনে অনেক আগে থেকে আমরা কীটনাশক ব্যবহার করে থাকি। নড়াইলে কীটনাশকের যে মার্কেটটা রয়েছে, সেখানে ১৫০ থেকে ২০০টি কম্পানি তাদের তাদের পণ্য বাজারজাত করছে। আমরা নড়াইলের প্রত্যেক উপজেলায় কৃষি কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রতিবছর ভেজাল কীটনাশকের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ অভিযান পরিচালনা করি; কীটনাশকের নমুনা সংগ্রহ করে প্রধান কার্যালয়ে মাধ্যমে পরীক্ষার ব্যবস্থা করি।
তিনি বলেন, ‘কোনো নমুনা ভেজাল এলে সংশ্লিষ্ট কম্পানিসহ যারা বাজারজাত করেন, তাদের বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এটি আমাদের একটা চলমান প্রক্রিয়া। ভেজাল কীটনাশকের বিষয়ে কৃষকদের ভেতর থেকে তেমন কোনো অভিযোগ আসে না।’
উপপরিচালক আরো বলেন, কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে কৃষকের ভুল হলো, মাঠপর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যেসব উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রয়েছেন, তাদের কাছ থেকে তারা (কৃষক) পরামর্শ নেন না। তারা বেশিরভাগই সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও কম্পানির মাঠপর্যায়ের প্রতিনিধির পরামর্শ নেন। তাদের মুখরোচক কথা, প্রলোভনে পড়ে তাদের কথামতো কীটনাশক ব্যবহার করেন। ফলে পোকার বিরুদ্ধে তা কার্যকর হয় না। তবে এ ব্যাপারে কৃষকদের সচেতন করতে মাঠপর্যায়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স